দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার ছবি, জন্মদিনের আয়োজন কিংবা সন্তানের স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনের ছবি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পোস্ট করা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বিষয়। আবার কেউ কেউ কোথায় আছেন, তা-ও তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন। দেখতে সাধারণ মনে হলেও এসব পোস্ট থেকেই একজন ব্যক্তির পরিচয়, সম্পর্ক, দৈনন্দিন রুটিন এমনকি অবস্থান সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারে সাইবার অপরাধীরা।
পরে এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে প্রতারণা, পরিচয় নকল, ফিশিং, অনুসরণ করে হয়রানি কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল অপরাধ চালানো সম্ভব বলে সতর্ক করেছেন সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করার আগে সহজ একটি অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে—‘পোস্ট করার আগে ভাবুন’।
কুইক হিল টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হরিশ কুমার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্ত শেয়ার করা এখন অনেকের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি পোস্টের মাধ্যমে ঠিক কতটা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে, তা ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না।
তার মতে, কোনো তথ্য একবার প্রকাশ্যে চলে গেলে তা কপি, সংরক্ষণ বা আবার ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি বিভিন্ন পোস্ট থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে একজন ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচিতি ও জীবনযাপনের ধরন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে প্রতারকেরা।
ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকেরা পরিচয় নকল ও পরিচয় চুরির পাশাপাশি সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা চালাচ্ছে। পরিচিত ব্যক্তির নাম, ছবি ও প্রকাশ্যে থাকা অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে পরে সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ভুক্তভোগীর বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুঠোফোন নম্বর, ব্যক্তিগত ই-মেইল ঠিকানা, বাড়ির ঠিকানা ও কর্মস্থলের তথ্য প্রকাশ না করাই ভালো। একইভাবে তাৎক্ষণিক অবস্থান, কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন বা কত দিন বাইরে থাকবেন—এ ধরনের তথ্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভ্রমণের পরিকল্পনা, ছুটির দিনের বিস্তারিত, বিমানের বোর্ডিং পাস, টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের তথ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। জাতীয় পরিচয়পত্র, প্যান কার্ডসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্রের ছবি বা নম্বর এবং আর্থিক লেনদেনের স্ক্রিনশটও প্রকাশ করা উচিত নয়। পাসওয়ার্ড, নিরাপত্তা প্রশ্ন বা অনলাইন অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে—এমন তথ্যও পোস্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কারণ, আলাদাভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হওয়া কয়েকটি তথ্যও একত্র করলে তা প্রতারকদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
মাল্টারবিটের ব্যবসায়িক ইউনিটের প্রধান বরুণ গ্রোভার বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে একজন মানুষের রেখে যাওয়া তথ্য দ্রুতই তার জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। একটি অবস্থান-চিহ্নিত ছবি বা দৈনন্দিন রুটিনের সামান্য উল্লেখ আলাদাভাবে হয়তো ক্ষতিকর মনে নাও হতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য একত্র করলে তা ফিশিং, পরিচয় নকল, অনুসরণ করে হয়রানি ও অন্যান্য ডিজিটাল অপরাধের পথ তৈরি করতে পারে।
প্রোটিভিটির ভারতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বৈভব কৌলও বলেন, অপরাধীরা ক্রমেই প্রকাশ্যে থাকা ছোট ছোট তথ্য একত্র করে বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা ও সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক হামলা চালাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে শিশুদের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে বলেছেন। স্কুলের পোশাক পরা কোনো শিশুর ছবি থেকে তার স্কুলের নাম বা অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আবার শিশুর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো পোস্ট থেকে তার নিয়মিত চলাফেরা ও অবস্থানের তথ্যও প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।
বৈভব কৌল বলেন, আজকের নিরীহ পারিবারিক পোস্ট ভবিষ্যতে একটি শিশুর স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ হয়ে যেতে পারে—যে পরিচয় সে নিজে কখনো বেছে নেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপনীয়তার সেটিংস ঠিক করে রাখলেই ব্যক্তিগত তথ্য পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। গোপনীয়তার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। কুইক হিলের হরিশ কুমারের পরামর্শ, তাড়াহুড়ো করে নয়, বরং ভেবে-চিন্তে তথ্য শেয়ার করতে হবে। কিছু পোস্ট করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—এতে কি আমার অবস্থান জানা যাবে? আমি কার সঙ্গে আছি, তা কি বোঝা যাবে? কেউ কি এই তথ্য ব্যবহার করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে? কিংবা এই তথ্য কি আমার পরিচয় নকল বা আমাকে প্রতারণার শিকার করতে কাজে লাগতে পারে?
এসব প্রশ্নের কোনো একটির উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে তথ্যটি অনলাইনে প্রকাশ না করাই ভালো। প্রয়োজনে তা শুধু বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে শেয়ার করা যেতে পারে।
বৈভব কৌল আরও একটি প্রশ্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন—‘এই তথ্য আগামী ১০ বছর অনলাইনে থাকলেও কি আমি স্বস্তি বোধ করব?’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অসতর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার শুধু সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি নয়; পরিস্থিতি ও প্রকাশিত তথ্যের ধরন অনুযায়ী এর আর্থিক, আইনি বা নিয়ন্ত্রক পরিণতিও হতে পারে। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা শুধু শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, দ্বি-স্তরীয় নিরাপত্তা বা নিরাপত্তা সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে না। অনলাইনে কী তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে নিরাপদ পোস্টটি সবসময় সবচেয়ে শক্তিশালী গোপনীয়তা সেটিংসযুক্ত পোস্ট নয়। বরং পোস্ট করার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করাই গুরুত্বপূর্ণ—‘এই তথ্যটি কি সত্যিই অনলাইনে দেওয়া দরকার?’
/অ